ক্ষমতা ও সংগ্রাম
ক্ষমতা মানেই আধিপত্য নয়। কোনো সভ্যতার হাতে শক্তি থাকলেই সে অন্যকে দমন করবে, এমনও নয়। ক্ষমতার আসল পরিচয় প্রকাশ পায় তখন, যখন তার সামনে দুর্বল কেউ দাঁড়িয়ে থাকে। সে মুহূর্তে শক্তি তাকে পদদলিত করে, নাকি রক্ষা করে, সেখানেই তার নৈতিকতা নির্ধারিত হয়।
ড. তারেক আল-সুওয়াইদানের আলোচনায় ভবিষ্যৎ ইসলামি সভ্যতার এই জায়গাটিই বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁর কাছে শক্তি কোনো আলাদা সামরিক অধ্যায় নয়। এটি ন্যায় প্রতিষ্ঠা, জুলুম প্রতিরোধ, জ্ঞানচর্চা, আত্মসংযম, দাওয়াহ এবং মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর দায়িত্ব।
এই ভাবনার শেষ অংশে তিনি ক্ষমতা ও জিহাদের পাঁচটি ভিত্তির কথা তুলে ধরেন।
১. ক্ষমতা, কিন্তু ন্যায়ের জন্য
ইসলামি সভ্যতার জন্য ক্ষমতা প্রয়োজন। তবে সেই শক্তির উদ্দেশ্য আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয়, বরং জুলুম ঠেকানো এবং ন্যায় রক্ষা করা।
এই ন্যায় শুধু মুসলিমদের জন্য নয়। একজন অমুসলিম যদি নিপীড়িত হয়, তার ক্ষেত্রেও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্বের কথা তিনি তুলে ধরেন। একইভাবে, অন্য দেশের সীমান্তের বাইরে কেউ নিপীড়নের শিকার হলেও সেই অন্যায়ের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা ইসলামি নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তিনি উপস্থাপন করেন।
কুরআনে বলা হয়েছে,
“তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব শক্তি ও যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করো…”
সূরা আল-আনফাল, ৮:৬০।
আবার রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের তুলনায় অধিক প্রিয় ও কল্যাণকর, যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এই হাদিসকে তিনি শুধু শারীরিক শক্তির অর্থে দেখেন না। জ্ঞান, সংগঠন, প্রস্তুতি এবং আত্মনির্ভরতার শক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামের ইতিহাসে সামরিক শক্তির প্রসঙ্গ এলে তাঁর আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্যও আসে। ক্রুসেডাররা যখন জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম পুনর্দখল করলে তাঁর উপস্থাপনায় সেই বিজয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিশোধের পরিবর্তে সংযম।
অর্থাৎ শক্তি থাকবে, কিন্তু শক্তির ওপর নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণও থাকবে।
ক্ষমতা তখনই সভ্যতার সম্পদ, যখন তা দুর্বলকে নিরাপত্তা দেয়, জালিমকে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়কে রক্ষা করে।
২. জিহাদ শুধু যুদ্ধ নয়
জিহাদ শব্দটির অর্থ সংগ্রাম বা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে শব্দটিকে কেবল যুদ্ধের অর্থে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ড. আল-সুওয়াইদান জিহাদকে তার বিস্তৃত অর্থে ব্যাখ্যা করেন। একজন মানুষ নিজের প্রবৃত্তি ও অহংকারের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম করে, জ্ঞান অর্জনের জন্য যে পরিশ্রম করে, সমাজের উন্নতির জন্য যে কাজ করে, সত্য কথা বলার জন্য যে ঝুঁকি নেয়, সেগুলোকেও তিনি জিহাদের বৃহত্তর ধারণার মধ্যে রাখেন।
কুরআনে এসেছে,
“আল্লাহর জন্য যথাযথভাবে সংগ্রাম করো।”
সূরা আল-হজ, ২২:৭৮।
এই সংগ্রামের একটি দিক জ্ঞানও। জ্ঞান অর্জন করা, তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং অজ্ঞতা দূর করার জন্য নিজের সময় ও শ্রম ব্যয় করা একটি সভ্যতা নির্মাণের কাজ।
এখানে তিনি ইমাম আহমদের উদাহরণ টানেন। তিনি কোনো যুদ্ধের নেতৃত্ব দেননি। কিন্তু মুসলিম শাসকদের সময় সংঘটিত মিহনা বা ধর্মীয় জিজ্ঞাসাবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। অর্থাৎ অস্ত্র হাতে না নিয়েও সত্য ও নীতির পক্ষে দাঁড়ানো এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম হতে পারে।
আর এ কারণেই জিহাদকে শুধু যুদ্ধের সমার্থক করে ফেললে শব্দটির বৃহত্তর অর্থটাই হারিয়ে যায়।
৩. যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষা
ইসলামি সভ্যতায় সশস্ত্র সংগ্রামের একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে তিনি প্রতিরক্ষার কথা তুলে ধরেন।
নিজের ভূমি রক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা, আগ্রাসন প্রতিহত করা কিংবা নিপীড়িত মানুষকে রক্ষা করা এই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কুরআনে প্রশ্ন করা হয়েছে,
“তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেই অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করো না…?”
সূরা আন-নিসা, ৪:৭৫।
এখানে যুদ্ধের প্রসঙ্গটি নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি আরও একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তিকে শহীদ বলা হয়েছে। অর্থাৎ আত্মরক্ষা এবং অন্যায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারণা ইসলামী নৈতিকতার একটি স্বীকৃত অংশ।
ড. আল-সুওয়াইদানের ইতিহাসপাঠে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের যুদ্ধগুলোকেও তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ছিল স্বাভাবিক বা প্রথম পছন্দের কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংঘটিত ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, যুদ্ধ নিজেই লক্ষ্য নয়; ন্যায়, নিরাপত্তা ও মানুষের অধিকার রক্ষা করাই লক্ষ্য।
৪. ক্ষমতার ওপর নৈতিকতার লাগাম
এখানেই ইসলামি সভ্যতার শক্তির ধারণা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা পায়।
যুদ্ধ হলেও সবকিছু বৈধ হয়ে যায় না।
ড. আল-সুওয়াইদান ইসলামী যুদ্ধনীতির আলোচনায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং যুদ্ধে সরাসরি অংশ না নেওয়া ধর্মীয় ব্যক্তিদের ক্ষতি না করার কথা উল্লেখ করেন। ফসল ও সম্পদ অকারণে ধ্বংস না করা, চুক্তি ও অঙ্গীকার রক্ষা করা এবং বিশ্বাসঘাতকতা থেকে বিরত থাকার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
কুরআনে বলা হয়েছে,
“সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।”
সূরা আল-বাকারা, ২:১৯০।
অর্থাৎ যুদ্ধের মধ্যেও সীমারেখা আছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যুদ্ধসংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো এবং পরবর্তীতে আবু বকর আস-সিদ্দিকের সেনাবাহিনীকে দেওয়া নির্দেশের উদাহরণ এনে তিনি বোঝান, সামরিক শক্তি মানেই নৈতিক বিধিনিষেধের বাইরে চলে যাওয়া নয়।
বরং বিপরীতটাই গুরুত্বপূর্ণ।
যে ক্ষমতা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে ক্ষমতা সভ্যতা রক্ষা করার বদলে ধ্বংসের কারণও হতে পারে।
তাই ইসলামী সভ্যতার শক্তির ধারণায় ক্ষমতার পাশাপাশি সংযমও একটি অপরিহার্য উপাদান।
৫. ক্ষমতার শেষ গন্তব্য দাওয়াহ
শেষ ভিত্তিটিই সম্ভবত পুরো আলোচনার অর্থকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করায়।
ক্ষমতা কেবল সেনাবাহিনী নয়। একটি সভ্যতার শক্তি তার ঈমান, জ্ঞান, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মানুষের কাছে তার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতার মধ্যেও নিহিত।
এখানে ক্ষমতার সঙ্গে দাওয়াহর সম্পর্ক তৈরি হয়।
কুরআন বলে,
“তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে…”
সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫।
আর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।”
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এই বক্তব্যের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বের কথা সামনে আসে।
তাই একটি সভ্যতার উদ্দেশ্য শুধু মানুষকে শাসন করা নয়। মানুষকে বোঝানো, জ্ঞান পৌঁছে দেওয়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং আল্লাহর দিকে আহ্বান করাও তার দায়িত্বের অংশ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে ড. আল-সুওয়াইদান এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেন। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক পরিবর্তন বা অত্যাচারী শাসন উৎখাতের সঙ্গে সামরিক শক্তি যুক্ত ছিল। কিন্তু পৃথিবীর বহু অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে অন্য পথে।
আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু অঞ্চলে বণিকদের যোগাযোগ, ব্যবসা, আচরণ ও দাওয়াহর মাধ্যমে ইসলাম মানুষের কাছে পৌঁছেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সেখানে কোনো বিশাল সেনাবাহিনী এগিয়ে যায়নি। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগই হয়ে উঠেছিল ইসলামের পরিচয়ের মাধ্যম।
অর্থাৎ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় সবসময় ভূখণ্ডের বিজয় নয়; কখনো তা মানুষের হৃদয় ও চিন্তার জগতে ঘটে।
ক্ষমতার অর্থ, শেষ পর্যন্ত ন্যায়
এখানেই ভবিষ্যৎ ইসলামি সভ্যতা নিয়ে পুরো আলোচনাটি এসে একটি পূর্ণ বৃত্ত তৈরি করে।
শুরুতে ছিল প্রশ্ন, ভবিষ্যতের একটি ইসলামি সভ্যতা কেমন হতে পারে। এরপর এসেছে তার চিন্তার ভিত্তি, মূল্যবোধ, শিক্ষা, জ্ঞান, অর্থনীতি, উন্নয়ন, শাসনব্যবস্থা, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, প্রশাসন, রাজনৈতিক সহযোগিতা, কৌশলগত প্রস্তুতি এবং সংকট মোকাবিলার কাঠামো।
সবশেষে এসেছে ক্ষমতা।
কিন্তু সেই শক্তির সংজ্ঞা শুধু অস্ত্র দিয়ে শেষ হয়নি।
ক্ষমতা সঙ্গে এসেছে ন্যায়।
ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে জ্ঞান।
ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে আত্মসংযম।
ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে মানুষের নিরাপত্তা।
আর ক্ষমতার সঙ্গে এসেছে দাওয়াহ ও রহমত।
এই দৃষ্টিতে ক্ষমতা কোনো সভ্যতার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। ক্ষমতা হলো একটি উপায়, যার মূল্য নির্ধারিত হয় তার উদ্দেশ্য এবং ব্যবহারের নৈতিকতার মাধ্যমে।
তাই ভবিষ্যতের ইসলামি সভ্যতার স্বপ্ন আসলে অতীতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান, যেখানে বিশ্বাস শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জ্ঞান প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে, ন্যায় আইনে রূপ নেবে, অর্থনীতি মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, শাসন জবাবদিহির অধীনে থাকবে এবং শক্তি দুর্বল মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে।
এই দীর্ঘ আলোচনার শেষ শিক্ষা তাই খুব সরল:
ক্ষমতা চাই, কিন্তু আধিপত্যের জন্য নয়।
জ্ঞান চাই, কিন্তু অহংকারের জন্য নয়।
ক্ষমতা চাই, কিন্তু জুলুমের জন্য নয়।
সভ্যতা চাই, মানুষের ওপর নয়, মানুষের কল্যাণের জন্য।
অতীত এখানে ফিরে যাওয়ার জায়গা নয়।
অতীত হলো শিক্ষা।
আর ভবিষ্যৎ হলো সেই শিক্ষা থেকে এমন কিছু নির্মাণ করার দায়িত্ব, যা এখনো জন্ম নেয়নি।





