সমর্থক হওয়া অপরাধ নয়। মানুষ দল পছন্দ করবে, নেতা পছন্দ করবে, দেশ বা ক্লাবকে ভালোবাসবে, তাদের নামে শ্লোগান দিবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ভালোবাসা বিচারবুদ্ধির ওপর বসে যায়; যখন নিজের দলের অন্যায়কে অন্যায় বলার নৈতিক শক্তি হারিয়ে যায়।
একটি সহজ পরীক্ষা দিয়ে শুরু করা যাক। আপনি যে দলের সমর্থক, সেই দলের কোনো অন্যায় আপনার কাছে ঠিক কতটা অন্যায় মনে হয়? আর হুবহু একই অন্যায় যদি প্রতিপক্ষ করে? সৎভাবে উত্তর দিলে আমাদের অধিকাংশই আবিষ্কার করব, আমাদের বিচারের দাঁড়িপাল্লা দুই পাশে সমানভাবে ঝোলে না। জার্সি বদলে গেলে ন্যায় বা ইনসাফের সংজ্ঞাটিও চুপিসারে বদলে যায়।
মানুষ যখন কোনো দল, নেতা, রাষ্ট্র, গোষ্ঠী কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়কে নিজের পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলে, তখন সে আর সত্যকে সত্য হিসেবে দেখে না। সে সত্যকে দেখে নিজের পক্ষের লাভ-ক্ষতির আলোতে। তখন হত্যার নাম হয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পক্ষপাতের নাম হয় ন্যায্যতা, আর বিচার চাওয়ার নাম হয় ষড়যন্ত্র। আমরা এক বিশাল পক্ষপাতদুষ্ট সমাজের বাসিন্দা। এই পক্ষপাত টিকে থাকলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা হবে না। “আইনের চোখে সবাই সমান”, কথাটিও তখন অর্থহীন থেকে যাবে।
মনের ভেতরের দলীয় আদালত
মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বোঝানোর জন্য কয়েকটি শক্তিশালী ধারণা আছে। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী লিওন ফেস্টিঙ্গার জ্ঞানগত অসামঞ্জস্য (cognitive dissonance) তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষ নিজের বিশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে অনেক সময় বিশ্বাসটিকেই রক্ষা করার জন্য অস্বস্তিকর সত্যকে অস্বীকার বা যুক্তিসিদ্ধ করে। পোলিশ-ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল তাঁর সামাজিক পরিচয় তত্ত্বে (social identity theory) দেখান, মানুষ কেবল গোষ্ঠী পরিচয়ের কারণেই নিজের দলকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করে। মার্কিন নৈতিক মনোবিজ্ঞানী জনাথান হেইড্টও নৈতিক বিচারকে অনেকটা “প্রথমে অনুভব, পরে যুক্তি” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ আমরা অনেক সময় আগে রায় দিই, পরে সেই রায়কে যুক্তি দিয়ে সাজাই।
এই মনস্তত্ত্বকে জর্জ অরওয়েল তাঁর জাতীয়তাবাদ নিয়ে নোটস (Notes on Nationalism) প্রবন্ধে আরও তীক্ষ্ণভাবে ধরেছিলেন। অরওয়েলের পর্যবেক্ষণ ছিল, অন্ধ আনুগত্য মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, তখন নিজের পক্ষের অন্যায়ও আর অন্যায় মনে হয় না। প্রায় আশি বছর পরও কথাটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন স্ক্রল করলেই মিলে যায়। রাজনীতির সমর্থক, ফুটবলের সমর্থক, ক্রিকেটের সমর্থক—সবখানেই একই মানসিক যন্ত্র কাজ করে।
আগে মানুষ দলীয় কার্যালয়, ম্যাগাজিনের পাতা বা পাড়ার আড্ডায় পক্ষপাত শিখত; এখন সে ফোনের স্ক্রিনেই পক্ষপাতের প্রশিক্ষণ পায়। অ্যালগরিদম তাকে বারবার সেই খবরই দেখায়, যা তার রাগ, ভয়, ঘৃণা বা দলীয় অহংকে খাওয়ায়। ফলে সে ভাবে, “সবাই তো আমার মতোই ভাবছে।” আসলে সে সবার মত শুনছে না; নিজের প্রতিধ্বনি শুনছে। এভাবে মানুষ নিজের মতের ভেতরেই বন্দী হয়ে যায়। ফলে পক্ষপাত আর ব্যক্তিগত দুর্বলতা থাকে না; ধীরে ধীরে সমাজের অভ্যাসে পরিণত হয়।
জার্সি বদলালে যুক্তিও বদলায়
পক্ষপাত সবচেয়ে খোলাখুলিভাবে ধরা দেয় খেলার মাঠে। কারণ সেখানে দলটি থাকে চোখের সামনে, ঘটনাটি হয় ক্যামেরাবন্দি, আর নিয়মও তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। তবু একই ঘটনা দুই পক্ষের চোখে দুই রকম ন্যায়বিচারে পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক উদাহরণই ধরা যাক। ৭ জুলাই চলতি ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে আটলান্টায় আর্জেন্টিনা ও মিশর মুখোমুখি হয়। মিশর ২-০ গোলে এগিয়ে ছিল দ্বিতীয়ার্ধের প্রায় শেষ পর্যন্ত। এরপর আর্জেন্টিনা শেষ দিকে দ্রুত তিন গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জিতে যায়। ম্যাচের পর মিশরের কোচ হোসাম হাসান প্রকাশ্যে রেফারিং নিয়ে ক্ষোভ জানান। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভিএআর পরীক্ষা করে মিশরের একটি গোল বাতিল করা হয়েছে; পেনাল্টির একটি দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে; আর আর্জেন্টিনার শেষ গোলের আগে ফাউলের প্রশ্নটি যথাযথভাবে দেখা হয়নি। তিনি এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচ আর দেখবেন না বলেও জানান।
লক্ষ্য করুন, একই ৯০ মিনিট থেকে তিনটি আলাদা নৈতিক গল্প তৈরি হয়। আর্জেন্টিনার সমর্থক বলেছে, “অসাধারণ প্রত্যাবর্তন; চ্যাম্পিয়ন দল এভাবেই ম্যাচে ফিরে আসে।” মিশরের সমর্থক বলেছে, “স্পষ্ট অবিচার; বড় দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত গেছে।” আর নিরপেক্ষ দর্শক বলছে, ভিডিও, নিয়ম, ভিএআর প্রোটোকল এবং রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতা দেখে বিচার করতে হবে। অর্থাৎ প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সমর্থকের সমস্যা প্রশ্ন তোলা নয়; সমস্যা হলো, তিনি অনেক সময় জার্সি দেখে আগেই উত্তর ঠিক করে রাখেন, তারপর সেই উত্তরের পক্ষে যুক্তি খোঁজেন।
এই পক্ষপাতমূলক বিতর্কের বিখ্যাত উদাহরণ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের। ম্যাচের ৫১ মিনিটে দিয়েগো মারাদোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের সঙ্গে লাফিয়ে উঠে মাথা নয়, হাত দিয়ে বল জালে পাঠান। রেফারি ঘটনাটি দেখতে পাননি, ফলে গোলটি বৈধ হিসেবে গণ্য হয়। পরে মারাদোনা নিজেই মজা করে বলেন, গোলটি হয়েছে “মারাদোনার মাথা দিয়ে একটু, আর ঈশ্বরের হাত দিয়ে একটু”—সেখান থেকেই “ঈশ্বরের হাত” নামটি বিখ্যাত হয়।
এখানে লক্ষণীয় ব্যাপারটি হলো, এটি ক্যামেরায় স্পষ্ট ধরা পড়া একটি প্রতারণা, অথচ আর্জেন্টিনার বহু সমর্থকের কাছে এটি আজও জাতীয় স্মৃতি, প্রতিভা ও প্রতিশোধের মিথ। কেন? কারণ ভুক্তভোগী ছিল প্রতিপক্ষ। কেননা, ১৯৬৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক রাত্তিনকে বিতর্কিতভাবে মাঠছাড়া করা হলে আর্জেন্টিনা একে ইউরোপীয় পক্ষপাত বলে দেখেছিল, ইংল্যান্ড দেখেছিল ন্যায্য সিদ্ধান্ত হিসেবে। যে যেই দলের, সে সেই দলের চোখে সিদ্ধান্তটি দেখেছে।
একইভাবে ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রিভালদো সামান্য আঘাতে মুখ চেপে লুটিয়ে পড়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে লাল কার্ড পাইয়ে দেন; ফিফা পরে তাঁকে অভিনয়ের জন্য জরিমানা করে। তা ছিলো ব্রাজিলিয়ানদের কাছে দুর্দান্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
কিন্তু নৈতিক প্রশ্নটি এখানেই। অন্যায়টি বদলায়নি, বদলেছে কেবল ভুক্তভোগীর পরিচয়। খেলার মাঠ তাই আমাদের একটি নির্মম সত্য দেখায়: আমরা অনেক সময় নিয়মের পক্ষে নই, নিজের দলের পক্ষে থাকি। নিজের দল সুবিধা পেলে সেটি হয় “বুদ্ধিমত্তা”, “খেলার অংশ” বা “ঐতিহাসিক মুহূর্ত”; প্রতিপক্ষ একই সুবিধা পেলে সেটি হয় “প্রতারণা”, “ষড়যন্ত্র” বা “ডাকাতি”।
রক্তেরও কি দল আছে?
খেলা তুলনায় নিরীহ, কারণ এখানে পক্ষপাতের মূল্য একটি ট্রফি, একটি ম্যাচ, একটি বিতর্ক। কিন্তু ঠিক এই একই মনস্তত্ত্ব যখন রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, বিচার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা কিংবা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে ঢোকে, তখন তা আর নিরীহ থাকে না।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাই আমাদের সামনে সেই কঠিন আয়না ধরে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে, জুলাই অভুত্থানে তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সহিংস উপাদানগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে পাওয়া মৃত্যুর তথ্যের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হয়ে থাকতে পারেন; আহত হয়েছেন হাজারো মানুষ। নিহতদের বড় অংশ গুলিবিদ্ধ হন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে, এবং নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু হতে পারে বলেও প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে।
প্রতিবেদনটি শুধু সংখ্যার হিসাব দেয়নি; রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ধরনও দেখিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের দমন করতে গুলি, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন, চিকিৎসা পাওয়ার পথে বাধা, হাসপাতাল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ জব্দ করা এবং আহতদের ভয় দেখানোর মতো অভিযোগ উঠে এসেছে। শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও আলাদা করে তুলে ধরা হয়েছে; এমনকি ছাদে দাঁড়িয়ে সংঘর্ষ দেখার সময় ছয় বছরের এক শিশুর গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে পুলিশ, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিক এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার কথাও উঠে এসেছে।
এখানেই পক্ষপাতের আয়নাটি সবচেয়ে নির্মম। এত বেশি বিস্তৃত বর্ণনা, ভিডিওফুটেজ, সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকার পরেও, একজন কট্টর আওয়ামী লীগ সমর্থকের কাছে রাষ্ট্রীয় এমন নির্মম হত্যাযজ্ঞ “সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার” অংশ বলে বিবেচিত হচ্ছে। জুলাই অভুত্থানের দুই বছর পরেও নানান অজুহাতে ‘তাকে’ জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করে শিশু, নারী, বৃদ্ধা—আপামর জনতাকে নির্বিচারে হত্যা ও আহত-পঙ্গুত্ব করাকেও জাস্টিফাইড বলতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের কেউ কেউ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভয়াবহতা দেখলেও জুলাই পরবর্তী প্রতিশোধমূলক হামলা, মাজারে হামলা কিংবা আইনবহির্ভূত মব কালচারকে ছোট করে দেখেন বা জাস্টিফিকেশন দেয়ার চেষ্টা করেন। দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা এক: ন্যায় নয়, পক্ষ আগে কথা বলছে।
তবে দলনিরপেক্ষ বিচার মানে সব পক্ষকে যান্ত্রিকভাবে সমান দোষী বলা নয়। রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র, আইন, কারাগার, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকে; তাই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার দায় কাঠামোগতভাবে অবশ্যই অনেক বেশি। একই সঙ্গে আবার মব কালচারকেও এই জন্য জাস্টিফাইড বলা যায় না। বিচার আদালত, প্রমাণ, তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চায়; প্রতিশোধ কেবল নতুন অন্যায় জন্ম দেয়।
ন্যায়ের অবস্থান তাই একটাই: রাষ্ট্রীয় হত্যাও অন্যায়, তেমনি মব হত্যা, দলীয় কোন্দলে হত্যাও অন্যায় আবার সংখ্যালঘুর ওপর হামলাও অন্যায়। একটি শিশুর প্রাণ শিশুরই প্রাণ; সে কোন দলের মিছিলের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা দিয়ে তার মৃত্যুর ওজন কমে-বাড়ে না। মাঠে ভুল রেফারিংয়ের মূল্য একটি হার; কিন্তু রাজনীতিতে পক্ষপাতের মূল্য একটি প্রাণ। তাই সর্বাবস্থায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা বিলাসিতা নয়, বাধ্যবাধকতা।
এই সত্য শুধু বাংলাদেশের নয়। রোহিঙ্গা নিপীড়নের ক্ষেত্রে কেউ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-বয়ানকে বড় করে দেখে, কেউ মানবতার বিপর্যয়কে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে এক পক্ষ নিরাপত্তা (security) বলে, অন্য পক্ষ দখলদারিত্ব (occupation) কিংবা সামষ্টিক শাস্তি (collective punishment) বলে। রাশিয়া-ইউক্রেন প্রশ্নেও নিরাপত্তা, আগ্রাসন ও আত্মরক্ষার বয়ান পরস্পরকে ধাক্কা দেয়। সব সংঘাত এক নয়, দায়ও এক নয়। কিন্তু পক্ষপাতের প্রক্রিয়াটি একই: নিজের পক্ষের কষ্ট স্পষ্ট, অন্য পক্ষের কষ্ট দর-কষাকষির বিষয়।
ইনসাফ দল-ধর্ম চেনে না
পক্ষপাত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান নতুন নয়। প্রায় সব বড় ধর্মীয় ও নৈতিক ঐতিহ্যই ন্যায়ের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা, দল, জাতি, শ্রেণি ও ঘৃণাকে অগ্রাহ্য করতে বলেছে। ইসলামে কুরআন নির্দেশ করে, ন্যায়ের ওপর দৃঢ় থাকতে হবে, যদিও তা নিজের, পিতা-মাতা বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধেই যায়। অন্যত্র বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা যেন মানুষকে অবিচারে প্ররোচিত না করে। হিন্দুধর্মের ধর্মধারণাতেও ন্যায়, সত্য ও কর্তব্যকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। বৌদ্ধধর্মের ধম্মপদে ন্যায়বান মানুষকে এমন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়, যিনি তাড়াহুড়ো করে রায় দেন না; সত্য-মিথ্যা যাচাই করেন। খ্রিষ্টধর্মে বিচারকাজে পক্ষপাত না করার শিক্ষা আছে। ইহুদি ঐতিহ্যেও বিচার বিকৃত না করা, দরিদ্র বা ক্ষমতাবান কাউকেই অন্যায় সুবিধা না দেওয়ার নির্দেশ আছে। শিখধর্ম মানুষকে সমতা, সেবা ও ন্যায়ভিত্তিক জীবনের শিক্ষা দেয়। জৈনধর্মের অহিংসা এবং অনেক পূর্বদেশীয় নৈতিক ঐতিহ্যের সংযম ও ন্যায্যতার ধারণাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। ভাষা ভিন্ন, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ভিন্ন, কিন্তু নৈতিক কেন্দ্রটি একই: ন্যায় তখনই ন্যায়, যখন তা নিজের লোকের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে।
ইতিহাসও পক্ষপাত ভাঙার সাক্ষী বহন করে। ১৭৭০ সালের বোস্টন গণহত্যার পর যখন শহর ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে ফুঁসছে, তখন জন অ্যাডামস অভিযুক্ত ব্রিটিশ সেনাদের আইনি প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেন। তিনি নিজে ব্রিটিশ করনীতির বিরোধী ছিলেন। তবু তিনি জানতেন, শত্রুও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখে। জুরির সামনে তিনি বলেছিলেন, তথ্য হলো একগুঁয়ে জিনিস; আমাদের ইচ্ছা, আবেগ বা ঝোঁক তথ্যের অবস্থা বদলে দিতে পারে না। নৈতিক সাহস এখানেই: নিজের পক্ষের আবেগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রমাণের পক্ষে দাঁড়ানো।
আইনের জার্সির রঙ কালো
আইনের জগতে এই দলনিরপেক্ষতা কেবল নৈতিক পরামর্শ নয়; প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি। এ কারণেই ন্যায়ের দেবীর চোখ বাঁধা থাকে। তিনি মুখ দেখেন না, পরিচয় দেখেন না, জার্সি দেখেন না; কেবল প্রমাণের ওজন মাপেন। আইনি ভাষায় এর নাম আইনের দৃষ্টিতে সমতা (equality before the law)। আরেকটি প্রাচীন নীতি হলো, কেউ নিজের মামলার বিচারক হতে পারে না (nemo iudex in causa sua)। কারণ নিজের পক্ষে মানুষ খুব সহজেই নিরপেক্ষতা হারায়। একজন অন্ধ সমর্থক আসলে প্রতিটি ঘটনায় নিজের দলের মামলার বিচারক হয়ে বসেন; তাই তাঁর রায় জন্মের আগেই পক্ষপাতদুষ্ট।
তাহলে এই পক্ষপাতদুষ্ট সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে কী দরকার? প্রথমত, একই কাজের জন্য একই নৈতিক মানদণ্ড। যে কাজ প্রতিপক্ষ করলে অন্যায়, নিজের দল করলে সেটিও অন্যায়। দ্বিতীয়ত, বিপরীত-পরীক্ষা। নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হবে, ঠিক এই কাজটি যদি আমার প্রতিপক্ষ করত, আমি কি একই কথা বলতাম? তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক দৃষ্টি। অপরাধী কোন দলের, তার আগে প্রশ্ন হতে হবে—কার ক্ষতি হলো? চতুর্থত, প্রমাণকে আবেগের আগে রাখা। পঞ্চমত, নিজের দলের অপরাধকেও অপরাধ বলার সাহস। ষষ্ঠত, প্রতিপক্ষকে অমানুষ না বানানো। সপ্তমত, প্রতিশোধকে বিচার বলা বন্ধ করা। বিচার প্রমাণ, আদালত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (due process) চায়; প্রতিশোধ কেবল নতুন অন্যায় জন্ম দেয়।
সমর্থক হওয়া অপরাধ নয়। দল, দেশ কিংবা প্রিয় খেলোয়াড়কে ভালোবাসা স্বাভাবিক ও সুন্দর। অপরাধ তখনই, যখন সেই ভালোবাসা আমাদের চোখ বেঁধে দেয়; যখন দল ন্যায়ের আগে দাঁড়িয়ে পড়ে আর সত্য নীরবে দলীয় হয়ে যায়। ইনসাফ কোনো দলের সম্পত্তি নয়। আইনের চোখে সবাই সমান—এই কথাটি ততক্ষণ ফাঁপা বুলি, যতক্ষণ না আমরা নিজের প্রিয় দলটিকেও সেই একই চোখে দেখতে শিখি। আমাদের প্রথম রাজনৈতিক শিক্ষা হওয়া উচিত: আমার দল ভুল করতে পারে, আমার নেতা অপরাধ করতে পারে, আমার প্রিয় জার্সিও অন্যায়কে ঢাকতে পারে।
মনে রাখতে হবে ইনসাফের জার্সির কোনো রঙ থাকে না।





