এক উম্মাহ, এক পৃথিবী, একটি দায়িত্ব
কোন সভ্যতা শুধু একটি ভূখণ্ডে গড়ে ওঠে না। তার চিন্তার পরিধি যদি সত্যিই বিস্তৃত হয়, তবে তা কোনো মানচিত্রের সীমানায় আটকে থাকে না। তার মানুষ কেবল নিজেদের বর্তমান নিয়ে ভাবে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, বৃহত্তর মানবসমাজ এবং পৃথিবীর প্রতি নিজেদের দায়িত্ব নিয়েও ভাবতে শেখে।
ড. তারেক আল-সুওয়াইদানের Future Islamic Civilization সিরিজের তৃতীয় পর্বে ইসলামি সভ্যতার এমনই কয়েকটি মৌলিক নীতি ও মানসিকতার কথা উঠে এসেছে। আগের পর্বে তিনি সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে তাওহিদ, খিলাফাহ, সামগ্রিকতা, ভারসাম্য ও মাকাসিদের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এবার তাঁর আলোচনা আরও বিস্তৃত হয়ে পৌঁছেছে ইসলামি সভ্যতার দৃষ্টিভঙ্গি, মানুষের দায়িত্ব, উম্মাহর চেতনা, ইতিহাস, সময় এবং নিয়তের মতো বিষয়গুলোর দিকে।
এই আলোচনার শুরুতেই তিনি এমন একটি ধারণা সামনে আনেন, যা পুরো পর্বটির সুর নির্ধারণ করে দেয়: ইসলামের বার্তা কোনো জাতি, ভাষা বা ভূখণ্ডের জন্য সীমাবদ্ধ নয়।
যে বার্তা কোনো সীমানায় থামে না
ইসলাম আরবদের জন্য আসেনি, কোনো নির্দিষ্ট জাতির জন্যও নয়। এমনকি এর বার্তা শুধু মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দায়িত্বকে সমগ্র মানবজাতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ
“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবেই প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।”
— সূরা সাবা, ৩৪:২৮
এই আয়াতের আলোকে ড. আল-সুওয়াইদান ইসলামকে একটি universal message হিসেবে দেখেন। এমন একটি বার্তা, যার ন্যায় ও রহমতের ধারণা কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির মধ্যে আবদ্ধ নয়।
ইসলামের ইতিহাসও এই সর্বজনীনতার কিছু দৃষ্টান্ত সামনে আনে। তিনি বিশেষভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কথা উল্লেখ করেন। ইন্দোনেশিয়া আজ বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ, অথচ সেখানে ইসলামের বিস্তারকে কেবল সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায় না। মুসলিম ব্যবসায়ী ও বণিকদের সততা, আচরণ এবং নৈতিকতার মাধ্যমেও ইসলামের পরিচয় মানুষের কাছে পৌঁছেছিল।
অর্থাৎ একটি সভ্যতার প্রভাব সবসময় তার শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে তৈরি হয় না। অনেক সময় মানুষের চরিত্রই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়।
ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রেও জবরদস্তির কোনো স্থান নেই। কুরআনের ঘোষণা স্পষ্ট:
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।”
— সূরা আল-বাকারা, ২:২৫৬
এখানে ইসলামি সভ্যতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। যে ধর্ম নিজেকে মানবতার জন্য রহমত হিসেবে উপস্থাপন করে, তার বিস্তারের আদর্শ পদ্ধতি মানুষের ওপর বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং ন্যায়, জ্ঞান, চরিত্র ও কল্যাণের মাধ্যমে মানুষকে সত্যের সঙ্গে পরিচিত করা।
ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার ভিত্তি
ইসলামি সভ্যতার পুনর্জাগরণ নিয়ে কথা বললে স্বাভাবিকভাবেই আরেকটি প্রশ্ন আসে: এই আশাবাদের ভিত্তি কী?
ড. আল-সুওয়াইদানের কাছে এর উত্তর কেবল ইতিহাসের গতিপথ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কিংবা ভূরাজনীতির হিসাব নয়। তাঁর আশাবাদের মূল জায়গা হলো আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস।
ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই প্রত্যয়ের একটি দৃষ্টান্ত তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সেই বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরেন, যেখানে এসেছে যে ইসলামের এই বিষয় বা বার্তা এমন স্থানে পৌঁছাবে, যেখানে দিন ও রাত পৌঁছে।
ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালে এর বিস্তারের গতি সত্যিই বিস্ময়কর। মক্কার একটি ছোট ও নির্যাতিত সম্প্রদায় থেকে শুরু করে মদিনায় একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই তৎকালীন পরিচিত বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলামের উপস্থিতি তৈরি হওয়া ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
কিন্তু এই আশাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে।
আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে না; বরং তাকে দায়িত্বশীল করে।
ভবিষ্যৎ ভালো হবে, তাই অপেক্ষা করে বসে থাকা নয়। বরং ভবিষ্যৎকে ভালো করার জন্য কাজ করাই এই বিশ্বাসের স্বাভাবিক ফল।
তাওয়াক্কুল: বিশ্বাসের সঙ্গে প্রচেষ্টা
এখানে এসে আলোচনাটি তাওয়াক্কুলের দিকে যায়।
আল্লাহর ওপর ভরসা করা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। কিন্তু তাওয়াক্কুলের অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। বরং মানুষ তার সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।
কুরআনে বলা হয়েছে:
وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ وَكِيلًا
“আর আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা করুন; কর্মসম্পাদনকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।”
— সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৩
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হিজরতের ঘটনাকে ড. আল-সুওয়াইদান এই নীতির বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখান। রাসুল ﷺ আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু একই সঙ্গে হিজরতের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ আল্লাহর ওপর নির্ভরতা তাঁর কর্মপ্রচেষ্টাকে বাতিল করেনি।
কুরআনে মরিয়ম (আ.)-এর ঘটনাতেও এমন একটি শিক্ষা রয়েছে। প্রসবের সময় তাঁকে খেজুরগাছের কাণ্ড নাড়াতে বলা হয়েছিল, যদিও একজন দুর্বল মানুষের পক্ষে তা কতটা সম্ভব, তা সহজেই অনুমেয়। তবু তাঁকে তাঁর অংশের কাজটি করতে হয়েছিল।
মূসা (আ.)-এর ঘটনাতেও আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর লাঠি সমুদ্রের দিকে আঘাত করেছিলেন। সমুদ্র বিভক্ত করার শক্তি লাঠির ছিল না। অলৌকিক ঘটনাটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু মানুষকে তার দায়িত্বের অংশটুকু পালন করতে হয়েছিল।
এই জায়গাটিই তাওয়াক্কুলের প্রকৃত সৌন্দর্যকে স্পষ্ট করে:
আল্লাহর ওপর ভরসা থাকবে, কিন্তু সেই ভরসা মানুষের চেষ্টা বন্ধ করে দেবে না।
সভ্যতাও এভাবেই তৈরি হয়। কোনো সভ্যতা শুধু আশা করে গড়ে ওঠে না। তার জন্য জ্ঞান, শ্রম, পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
উত্তরাধিকার মানে অনুকরণ নয়
একটি সভ্যতার শক্তি তার অতীতের প্রতি শ্রদ্ধায় যেমন থাকে, তেমনি থাকে নতুন কিছু চিন্তা করার ক্ষমতায়।
ড. আল-সুওয়াইদান মুসলিম সমাজকে অন্ধ অনুকরণ থেকে সতর্ক করেন। অন্যের কাছ থেকে শেখা প্রয়োজন, আলেমদের জ্ঞান থেকে উপকৃত হওয়া প্রয়োজন, পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করা প্রয়োজন। কিন্তু শেখা এবং না বুঝে অনুকরণ করা এক বিষয় নয়।
কারণ একটি সভ্যতা যদি শুধু পুরোনো উত্তর পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে নতুন যুগের নতুন প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?
এই কারণেই তিনি ইবনে খালদুনের উদাহরণ সামনে আনেন। তিউনিসিয়ার এই মহান চিন্তাবিদ শুধু পূর্ববর্তী ধারণাগুলো পুনরাবৃত্তি করেননি; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, শাসন ও সভ্যতার উত্থান-পতনকে বিশ্লেষণের একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর চিন্তা পরবর্তী সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।
এখানে শিক্ষা খুব সরল, কিন্তু গভীর:
অতীতকে জানতে হবে, কিন্তু ভবিষ্যৎকে অতীতের অনুলিপি বানানো যাবে না।
একটি জীবন্ত সভ্যতা তার উত্তরাধিকার বহন করে সামনে এগোয়; পেছনে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে না।
উম্মাহ: সীমানার ওপারে একটি পরিচয়
এরপর আলোচনাটি পৌঁছে যায় উম্মাহর ধারণায়।
আধুনিক পৃথিবী মানুষকে বিভিন্ন রাষ্ট্র, জাতীয়তা, ভাষা ও জাতিগত পরিচয়ে ভাগ করেছে। এসব পরিচয় বাস্তব, কিন্তু ইসলামি চেতনায় এগুলো মানুষের সর্বশেষ পরিচয় নয়।
ড. আল-সুওয়াইদান মুসলিমদের এমন একটি চেতনার কথা বলেন, যেখানে তারা নিজেদের একটি বৃহত্তর উম্মাহর অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, রাষ্ট্র আলাদা হতে পারে; কিন্তু ঈমান ও নৈতিক দায়িত্বের একটি বৃহত্তর বন্ধন তাদের যুক্ত করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ককে একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে:
“মুমিন মুমিনের জন্য একটি ভবনের মতো; যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।”
আরেক বর্ণনায় মুমিনদের একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার একটি অঙ্গ কষ্ট পেলে পুরো দেহ তার প্রতিক্রিয়া অনুভব করে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির অর্থ হলো, পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো মুসলিম মানুষের ওপর সংকট নেমে এলে সেটিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখা।
ড. আল-সুওয়াইদান ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, একজন মুসলিমের কাছে এটি শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি উম্মাহর একটি অংশের কষ্ট।
ইসলামের ইতিহাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সময়ও তিনি এমন একটি বৃহত্তর সংহতির উদাহরণ দেখতে পান। জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম কেবল একটি স্থানীয় ঘটনা ছিল না; মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর অংশ এতে নিজেদের সম্পৃক্ত মনে করেছিল।
এখানে তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
রাষ্ট্রের সীমানা মানুষের হৃদয়ের সীমানা হয়ে যাওয়া উচিত নয়।
ইতিহাস: গৌরবের অ্যালবাম নয়, সতর্কবার্তাও
একটি সভ্যতা যদি তার ইতিহাস থেকে শুধু গৌরবের গল্প সংগ্রহ করে, তাহলে সে ইতিহাসের অর্ধেকই পড়েছে।
ইসলাম ইতিহাসকে দেখার জন্য মানুষকে পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার আহ্বান জানায়। কুরআনে বলা হয়েছে:
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِنْ قَبْلُ
“বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণতি কেমন হয়েছিল।”
— সূরা আর-রূম, ৩০:৪২
এখানে শুধু ভ্রমণের কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে দেখতে। অর্থাৎ ইতিহাসকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, বিশ্লেষণ করতে হবে এবং তার ভেতরের কারণগুলো বুঝতে হবে।
আন্দালুসের পতনের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিমরা সেখানে শত শত বছর ধরে একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। জ্ঞান, দর্শন, স্থাপত্য, চিকিৎসা ও সংস্কৃতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। কিন্তু সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষও এসেছিল।
ড. আল-সুওয়াইদানের ব্যাখ্যায় অভ্যন্তরীণ বিভাজন ছিল পতনের বড় কারণগুলোর একটি। নিজেদের মধ্যে সংঘাত, পরস্পরের বিরুদ্ধে বাইরের শক্তির সহায়তা নেওয়া এবং রাজনৈতিক বিভাজন ধীরে ধীরে সেই সভ্যতাকে দুর্বল করে দেয়।
ইতিহাস তাই শুধু বলে না, “আমরা একসময় কী ছিলাম।”
ইতিহাস আরও জিজ্ঞেস করে:
“আমরা কেন ভেঙে পড়েছিলাম?”
এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য হয়তো আরও জরুরি।
সময়: যে পুঁজি একবার হারালে ফেরে না
সভ্যতা নির্মাণের আলোচনায় অর্থ, জ্ঞান ও সম্পদের কথা আমরা সহজেই ভাবি। কিন্তু এর চেয়েও মৌলিক একটি সম্পদ রয়েছে, যার কোনো সঞ্চয়াগার নেই।
সেটি হলো সময়।
ড. আল-সুওয়াইদান সময়কে সভ্যতার অন্যতম মূল্যবান পুঁজি হিসেবে দেখেন। একজন মানুষের জীবন যেমন সময়ের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি একটি জাতির অগ্রগতিও নির্ভর করে সে তার সময়কে কীভাবে ব্যবহার করছে তার ওপর।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি প্রসিদ্ধ উপদেশে এসেছে:
“পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটির আগে মূল্যবান মনে করো: তোমার বার্ধক্যের আগে তোমার যৌবন, অসুস্থতার আগে তোমার সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে তোমার সম্পদ, ব্যস্ততার আগে তোমার অবসর এবং মৃত্যুর আগে তোমার জীবন।”
— আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৭৮৪৬
এই বাণীর ভেতরে সময়ের একটি গভীর দর্শন রয়েছে। মানুষ সাধারণত যা হারানোর পর তার মূল্য বোঝে, ইসলাম তার আগেই তা কাজে লাগাতে বলে।
ইমাম বুখারির জীবনকে ড. আল-সুওয়াইদান এর একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। জ্ঞান সংগ্রহ, হাদিস যাচাই এবং তা সংরক্ষণের জন্য তিনি তাঁর জীবনের বিপুল সময় ব্যয় করেছিলেন। আজ বহু প্রজন্ম সেই শ্রমের সুফল গ্রহণ করছে।
একজন মানুষের সময় তাই কেবল তার নিজের জীবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। সে সময়কে কীভাবে ব্যবহার করছে, তার প্রভাব অনেক সময় তার মৃত্যুর পরও থেকে যায়।
সভ্যতা নির্মাণের অর্থই হলো এমন কিছু কাজে সময় দেওয়া, যার পূর্ণ ফল হয়তো নিজের জীবদ্দশায় দেখা যাবে না।
পৃথিবী শুধু বসবাসের জায়গা নয়
ইসলামি সভ্যতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো পৃথিবীকে শুধু ভোগের স্থান হিসেবে না দেখে নির্মাণের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা।
কুরআনে হুদ (আ.)-এর বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষের পৃথিবীতে দায়িত্বের একটি দিক তুলে ধরা হয়েছে:
هُوَ أَنشَأَكُم مِّنَ الْأَرْضِ وَاسْتَعْمَرَكُمْ فِيهَا
“তিনি তোমাদেরকে পৃথিবী থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে তাতে বসতি স্থাপনের দায়িত্ব দিয়েছেন।”
— সূরা হুদ, ১১:৬১
ড. আল-সুওয়াইদান এখানে আরবি استعمركم শব্দটির দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর ব্যাখ্যায় এর মধ্যে শুধু পৃথিবীতে বসবাসের অর্থ নয়, পৃথিবীকে আবাদ ও নির্মাণ করার দায়িত্বের দিকটিও রয়েছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সভ্যতা নির্মাণ কেবল বস্তুগত উন্নয়ন নয়। মানুষ পৃথিবীকে শারীরিকভাবে যেমন গড়ে তুলবে, তেমনি জ্ঞান, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির দিক থেকেও তাকে সমৃদ্ধ করবে।
এই কারণেই মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে মসজিদের পাশাপাশি গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, উদ্যান, নগর, জলাধার ও নানা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল।
একটি সভ্যতা কেবল ইবাদতের স্থান তৈরি করে না; মানুষের বসবাসের পৃথিবীকেও সুন্দর করার চেষ্টা করে।
এই নির্মাণ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়, তবে সেটিও ইবাদতের অর্থ ধারণ করতে পারে।
সব কাজের অন্তরে যে জিনিসটি থাকতে হয়
এতক্ষণ পর্যন্ত আলোচনা ছিল সভ্যতা, সমাজ, ইতিহাস, সময় ও পৃথিবী নিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ড. আল-সুওয়াইদান আলোচনাটিকে ফিরিয়ে আনেন মানুষের সবচেয়ে ভেতরের জায়গায়।
নিয়ত।
ইসলামে একটি কাজের বাহ্যিক রূপই তার সবকিছু নয়। কাজটির পেছনে মানুষের উদ্দেশ্য কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক নিয়ত সাধারণ একটি কাজকেও অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে। একজন মানুষ যদি বিশ্রাম নেয় এই উদ্দেশ্যে যে সে নতুন শক্তি নিয়ে ইবাদত করবে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করবে কিংবা মানুষের উপকারে কাজ করবে, তবে তার সেই বিশ্রামও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
পরিবারের জন্য উপার্জন, সন্তানদের যত্ন নেওয়া, জ্ঞান অর্জন, মানুষের উপকার করা—সবকিছুই নিয়তের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরিচালিত হতে পারে।
অর্থাৎ ইসলাম মানুষের জীবনকে কেবল কিছু নির্দিষ্ট ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে না। বরং জীবনের সাধারণ কাজগুলোকেও অর্থপূর্ণ করে তোলার একটি পথ দেখায়।
এই কারণেই ড. আল-সুওয়াইদান নিজের জীবনদর্শনের একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশ হিসেবে যে বাক্যটি বেছে নিয়েছেন, সেটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ:
“My whole life is for God.”
একটি সভ্যতার স্বপ্ন যত বড়ই হোক, তার ভিত্তি শেষ পর্যন্ত মানুষের অন্তরেই। নিয়ত যদি বিশুদ্ধ না হয়, তবে বড় বড় কাজও ব্যক্তিগত অহংকার, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতির মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। আর নিয়ত সঠিক হলে ছোট কাজও বৃহত্তর কল্যাণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গায় এসে সভ্যতা নির্মাণের আলোচনা আবার ব্যক্তিমানুষের কাছে ফিরে আসে।
ভবিষ্যৎ সভ্যতার মানুষ কেমন হবে?
তৃতীয় পর্বের আলোচনাগুলো একসঙ্গে রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ড. আল-সুওয়াইদানের কাছে ভবিষ্যৎ ইসলামি সভ্যতা কেবল একটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রকল্প নয়। তার আগে এটি মানুষের চিন্তা ও চরিত্রের একটি প্রকল্প।
এমন মানুষ প্রয়োজন, যে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, কিন্তু কাজ থেকে পালাবে না; অতীতকে সম্মান করবে, কিন্তু অন্ধভাবে অনুকরণ করবে না; নিজের জাতি ও রাষ্ট্রকে ভালোবাসবে, কিন্তু তার মানবিক দায়িত্বকে সীমান্তের মধ্যে আটকে রাখবে না; ইতিহাসের গৌরব মনে রাখবে, কিন্তু তার পতনের কারণও বিশ্লেষণ করবে।
এমন মানুষও প্রয়োজন, যে সময়কে অবহেলা করবে না এবং পৃথিবীকে শুধু ভোগের বস্তু হিসেবে দেখবে না। যে জানবে, তার জ্ঞান, শ্রম, সময় ও প্রতিভা তার নিজের জন্য যেমন, তেমনি বৃহত্তর মানবসমাজের জন্যও একটি আমানত।
আর সবশেষে প্রয়োজন এমন একটি নিয়ত, যা তাকে মনে করিয়ে দেবে—সভ্যতা নির্মাণের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য কেবল ক্ষমতা অর্জন নয়।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের কল্যাণে কিছু রেখে যাওয়া।
শেষ কথা
একটি সভ্যতা একদিনে তৈরি হয় না। তার পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের ছোট ছোট কাজ, বহু বছরের জ্ঞানচর্চা, ত্যাগ, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, ভুল থেকে শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের প্রতি বিশ্বাস।
আজ যে মানুষটি একটি বই লিখছেন, হয়তো তিনি জানেন না শত বছর পরে কে তা পড়বে।
আজ যে শিক্ষক একজন ছাত্রকে চিন্তা করতে শেখাচ্ছেন, হয়তো তিনি জানেন না সেই ছাত্র একদিন কত মানুষের জীবন বদলাবে।
আজ যে মানুষটি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন, হয়তো তার পূর্ণ সুফল তিনি নিজে দেখতে পাবেন না।
তবু কাজগুলো থেমে থাকে না।
কারণ সভ্যতা নির্মাণের অর্থই হলো নিজের সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে যাওয়া।
আর এই ভবিষ্যৎ যদি সত্যিই ইসলামি সভ্যতার ভবিষ্যৎ হয়, তবে তার দৃষ্টি কোনো একটি জাতি, ভাষা কিংবা ভূখণ্ডে থেমে থাকার কথা নয়।
তার সামনে থাকবে একটি উম্মাহ, একটি পৃথিবী এবং একটি বৃহত্তর দায়িত্ব।
নিজের সময়ের জন্য নয় শুধু, আগামী সময়ের জন্যও বেঁচে থাকা।
আর সেই দীর্ঘ যাত্রার শুরু হতে পারে মানুষের নিজের ভেতর থেকেই—তার চিন্তা থেকে, তার কর্ম থেকে এবং সবশেষে তার নিয়ত থেকে।





